কেন শেষ ম্যাচে একই সময়ে মাঠে নামে গ্রুপের সব দল?

বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বের শেষ রাউন্ডের খেলা শুরু হচ্ছে মঙ্গলবার (২৯ নভেম্বর) থেকে। প্রথম দিন মুখোমুখি হচ্ছে গ্রুপ -এ ও গ্রুপ -বি এর দলগুলো। এতদিন আলাদা আলাদা সময়ে ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হলেও, গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে প্রতিটি গ্রুপের চারটি দলের ম্যাচ একই সময়ে অনুষ্ঠিত হবে। শুরুর দিকে আলাদা সময়ে ম্যাচগুলো হলেও ১৯৮২ বিশ্বকাপের একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে একই সময়ে মুখোমুখি হয় গ্রুপের চারটি দলই।

১৯৮২ বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানি-অস্ট্রিয়া ম্যাচের একটি দৃশ্য

বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বের তৃতীয় রাউন্ডের খেলা বাকি। প্রথম দুই ম্যাচ শেষে শেষ ষোলো নিশ্চিত হয়ে গেছে ফ্রান্স, ব্রাজিল ও পর্তুগালের। বাকি ১৩টি দল নির্ধারিত হবে তৃতীয় ম্যাচ শেষে।

মঙ্গলবার থেকে শুরু হচ্ছে গ্রুপপর্বের তৃতীয় রাউন্ডের খেলা। এদিন গ্রুপ ‘এ’ এর ম্যাচে রাত ৯টায় স্বাগতিক কাতারের মুখোমুখি হবে নেদারল্যান্ডস। আরেক ম্যাচে একই সময়ে মুখোমুখি হচ্ছে সেনেগাল ও ইকুয়েডর।

রাত ১টায় অনুষ্ঠিত হবে গ্রুপ ‘বি’ এর দুটি ম্যাচ। ওয়েলস মুখোমুখি হবে প্রতিবেশী ইংল্যান্ডের। ওপর ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্র খেলবে ইরানের বিপক্ষে। এই সূচির কারণে একই সময়ে দুই প্রিয় দলের খেলা দেখা থেকে বঞ্চিত হতে হবে দর্শকদের। টিভি বা বড় পর্দায় বারবার চ্যানেল ঘুরিয়ে দেখে নিতে হবে অন্য দলের ফল।

তবে বিশ্বকাপে দীর্ঘদিন এমন নিয়ম ছিল না। প্রথম দুই ম্যাচের মতো তৃতীয় ম্যাচও হতো আলাদা সময়ে। মূলত একটি কুখ্যাত ঘটনার পর থেকে বদল আনা হয় তৃতীয় ম্যাচের সূচিতে।

ঘটনার দুই হোতা পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া। ১৯৮২ বিশ্বকাপে দুই নম্বর গ্রুপে এই দুই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ছিল চিলি ও প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে আসা আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়া।

 

প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে এসেই আলজেরিয়া ২-১ গোলে হারিয়ে দেয় ফেবারিট পশ্চিম জার্মানিকে। দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রিয়ার কাছে ২-০ গোলে হারলেও নিজেদের তৃতীয় ম্যাচে ৩-২ ব্যবধানে জিতে যায় চিলির বিপক্ষে। ফলে প্রথমবার খেলতে এসেই শেষ ষোলোয় খেলার সম্ভাবনা জাগে তাদের।

সে সময় গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ হতো আলাদা আলাদা সময়ে। তাই গ্রুপের শেষ ম্যাচের আগে অপর প্রতিপক্ষ দুই দলের ম্যাচের ফল জেনে মাঠে নামার সুযোগ ছিল। ফলে পরের রাউন্ডের সমীকরণ জেনে সুযোগ থাকত গড়াপেটার বা আপসে ম্যাচ ছেড়ে দেয়ার সুযোগ। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়েছিল ইউরোপের দুই প্রতিবেশী পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া।

গ্রুপের শেষ ম্যাচটি ছিল পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে। এই ম্যাচের আগে সমীকরণ ছিল এমন –

গ্রুপের শীর্ষ দুই দল অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়ার পয়েন্ট ছিল সমান ৪। তাই শেষ ম্যাচে অস্ট্রিয়া পশ্চিম জার্মানিকে হারালে বা ড্র করলে পরের পর্বে উঠে যাবে অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া। ছিটকে যেত পশ্চিম জার্মানি।

আর যদি জার্মানি জিতে যেত তবে তিনদলের পয়েন্ট দাঁড়াত ৪  পয়েন্ট করে। তখন নির্ধারক হত গোল পার্থক্য। জার্মানি বড় জয় পেলে তাদের সঙ্গী হিসেবে যেত আলজেরিয়া। বাদ পড়ত অস্ট্রিয়া।

এমন সমীকরণ সামনে রেখে ম্যাচ খেলতে নেমে ম্যাচের ১০ মিনিটের মাথায় গোল পেয়ে যায় পশ্চিম জার্মানি। গোল পাওয়ার পর দুই দল আর কোনো প্রতিযোগিতাই করেনি। বরং নিজেদের মধ্যে পাস বিনিময় করে কাটিয়ে দেয় পুরো সময়টা। আলজেরিয়া ছিটকে যায়। পরের রাউন্ডে যায় পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া।

এই ম্যাচের বিরুদ্ধে ওঠে ম্যাচ গড়াপেটার অভিযোগ। বলা হয়, আলজেরিয়াকে বাদ দিয়ে দুই প্রতিবেশী পরের পর্বে যেতে নিজেদের মধ্যে আপসরফায় ম্যাচটি খেলেছে।

সেই ম্যাচে একটা সময় পর কমেন্টেটররা ধারাভাষ্য দেয়া প্রায় বন্ধ করে দেন। যারা টিভিতে খেলা দেখছিলেন, তাদেরও খেলা দেখা বন্ধ করে দিতে বলেন। ম্যাচের পর আলজেরিয়া ফিফার কাছে তদন্তের দাবি জানায়। তদন্তে অবশ্য জার্মানি-অস্ট্রিয়া দুদলই অস্বীকার করে অভিযোগ। ব্যাপারটা আর বেশিদূর এগোয়নি। তবে  এমন বিতর্ক এড়াতে খুঁজে বের করে সমাধান।

স্পেনের গিজনে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচটিকে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বাজে ও বিতর্কিত ম্যাচ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়।

এরপর ১৯৮৬ বিশ্বকাপ থেকে বদলে ফেলা হয় ফিকশ্চারই। প্রথম দুই ম্যাচ আগের মতো আলাদা সময়ে অনুষ্ঠিত হলেও, গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচগুলো আয়োজন করা হয় একই সময়ে। তখন থেকেই গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে গ্রুপের চার দল একই সময়ে মাঠে নামে। মূলত অন্যদলের ফলাফল জেনে গড়াপেটার সুযোগ যেন না পায়, তার জন্যই এই ব্যবস্থা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.